যখন এই ঘটনাটা ঘটে যখন আমি ইন্টার ফার্স্ট/সেকেন্ড ইয়ারে পড়ি। সেসময় নানান রকমের বাইক ও বাইকার্স গ্রুপগুলো নিয়ে আমার মধ্যে খুব ক্রেজ কাজ করতো। আমার এক বন্ধু আছে নাম দুর্জয়, তার বাইকের প্রতি প্রচুর নেশা। তার মাধ্যমেই আমি এই বাইকের জগতে আসক্ত। তার মাধ্যমে ফেসবুকে এক ভাইয়ের সাথে পরিচয় হয়। উনার নাম নীরব (ছদ্মনাম),বাসা রাজশাহী বিভাগের নাটোর জেলার এক গ্রামে। তো দুর্জয় আমাকে একদিন বলে যে, নতুন ভাইয়ের নাকি নিজেরই সাত/আটটার মতো বাইক আছে যেটা যখন ইচ্ছা তখন সেটা ব্যবহার করে। আমার মনে এই বিষয়টি নিয়ে কৌতূহল জাগলো আসলেই কি তাই! একজন মানুষের এতগুলো বাইক? কখনও শুনিনি তো,বাংলাদেশেও এমন কেও আছে, বাইরের কান্ট্রি হলে কোনো বিষয়ই না। তখন যেহেতু বিভিন্ন বাইকার গ্রুপ ও বাইকার ভাইদের সাথে ফেসবুকে ভার্চুয়ালি ও অফলাইনে যোগাযোগ রাখতাম তাই উনার সাথেও মাঝেমধ্যেই কথা হতো। উনাকে আমি আমার বন্ধুর রেফারেন্স দিয়ে ফেসবুকে কথার ফাঁকে জিজ্ঞেস করি, ভাই আমি দুর্জয়ের মুখে শুনলাম, আপনার নাকি নিজের সাত/আটটার মতো বিভিন্ন ব্র্যান্ডের বাইক রয়েছে? উনিও আমার সাথে হ্যাঁ সূচক সম্মতি দেন এবং বলেন নাটোরে আসো তোমরা দুজন একসাথে, ঘুরবো আমরা বাইক নিয়ে। আমিও বলি যাব ভাই ইন শা আল্লাহ একদিন, আর আপনিও রাজশাহী শহরে আসলে ফোন দিয়েন।
ঘটনার দিন আমি কলেজে আছি হঠাৎ করে উনার ফেসবুকে মেসেজ পাই, উনি বলেন,
- রাজশাহী আসছি। তোমার ফোন নাম্বার দিও।
- আচ্ছা,আসেন ভাইয়া।
প্রায় আধা ঘণ্টা পর উনি ফোন দেন,
- ভাইয়া আমিতো এখন তালাইমারিতে আছি, তুমি কি ফ্রি আছো? দেখা করবা?
- হ্যাঁ,ভাই অবশ্যই দেখা করবো। সাহেব বাজার মনিচত্বরে এ আসেন।
- আচ্ছা, তুমি থাকো আমি আসছি।
উনি তখন মনিচত্বরে আসেন, সাথে উনার একটা বন্ধু। আমাদের মধ্যে সেখানে কিছুক্ষণ কথা হয়। তারপর উনি বলেন,
- নাঈম, চলো কোথাও থেকে আমরা ঘুরে আসি।
- হুম, চলেন ভাই কাছাকাছি কোথাও যাওয়া যায়।
- নওগাঁ পাহাড়পুরে যাবে?
- হ্যাঁ, ভাই সেখানে যাওয়া যায়,আমারও দেখা হয়নি জায়গাটা।
- কি বলো? নওগাঁ যাওনি?
- না, ভাইয়া।
এরপর উনি বলেন,
- আচ্ছা, নাঈম তোমার কাছে কিছু টাকা হবে?
- কতো টাকা ভাই?
- এই ধরো ৪/৫০০/= টাকা।
- না ভাই, এতো টাকা তো হবেনা, ১৫০/২০০ টাকা হবে।
- হ্যাঁ, ভাইয়া। গাড়িতে তেল নাইতো,তেল তোলা লাগবে, আমরা ঘুরবো, আবার নাটোরেও ফেরা লাগবে। আমরা আবার হুটহাট রাজশাহী চলে এসেছি,সাথে টাকা আনিনি।
- আচ্ছা ভাই, সমস্যা নাই আমি দিচ্ছি।
- হ্যাঁ,তুমি দাও, আমি তোমাকে বাসায় গিয়ে বিকাশে টাকা দিয়ে দিচ্ছি।
- আচ্ছা ভাই দিয়েন,সমস্যা নাই।
তারপর উনি আমাকে নিয়ে যান তালাইমারি নয়ন পেট্রোল পাম্প এ। সেখান থেকে গাড়িতে তেল লোড করে উনি বলেন,
- নাঈম, শিবপুরে যাবা চা খেতে?
- না ভাই, শিবপুরের দিকে যাবো না, সেখানে গেলে বাসায় আসতে সময় লেগে যাবে।
- আরে চলো সমস্যা নাই, আমি তোমাকে আবার রাজশাহী রেখে যাবো।
- তাহলে চলেন ভাই।
তারপরে উনার সাথে শিবপুরের দিকে রওনা দেই। শিবপুরে বাইক থামিয়ে সেখানকার বিখ্যাত দুধ চা খাই, চা খাওয়ার পরে বিল দেয়ার সময় আবার নীরব ভাই আমাকে বলেন,
- নাঈম তোমার কাছে খুচরা টাকা আছে?
- ভাই,খুব বেশি নাই, আছে কিছু।
- আমাদের চায়ের বিলটা একটু দিয়ে দাও, একেবারে ফাঁকা পকেটে হুট করেই রাজশাহীতে চলে আসছি বলেছি তো তোমাকে, তোমাকে টাকা বিকাশে এইটার টাকাও পাঠিয়ে দেবো।
চায়ের বিলটা দেওয়ার পর বাইক স্টার্ট দিয়ে উনি বলেন,
- চলো নাঈম, যখন শিবপুর আসছো নাটোর পর্যন্ত চলো।
- না ভাই, নাটোর অব্দি যাবো না আর। বাসায় যাবো,এমনিতেও বাসায় না বলে এতদূর চলে এসেছি।
- আরে চলো, আমাদের নাটোর ঘুরে আসো।
- না ভাই, আর তাছাড়া নাটোরে গেলে বাসায় আসার ভাড়াটাও আমার কাছে নাই।
- আরে চলো, নাটোরে পৌঁছে তোমাকে আমি টাকা দিয়ে দিচ্ছি। ১/২ ঘণ্টা ঘুরে বাসায় চলে এসো।
উনার ভরসায় আমি নাটোর যেতে রাজি হই। নাটোরে পৌঁছানোর পর উনি আমাকে নাটোর স্টেশনের কাছাকাছি নামিয়ে দেন এবং বলেন, তোমার এই ভাইয়ার (উনার বন্ধু) একটু কাজ আছে বুঝছো দুই/তিন ঘণ্টার জন্য। এই দুই/তিন ঘন্টা তুমি একটু নাটোর ঘোরাঘুরি করো, তারপরে আমাদের সাথে একসাথে বিকেলের দিকে ঘুরে বাসায় চলে যাও।
তখন আমি বললাম,
- ভাই, বিকেল অব্দি থাকা যাবেনা, আর আমি বাসায় কিভাবে যাবো? সব টাকা তো ভাই খরচ করে ফেলেছি, সেজন্য বলছিলাম,নাটোর অব্দি যাবো না। আমি তো আপনার ভরসায় নাটোরে আসলাম।
- আমি কি তোমাকে জোর করে এনেছি? (অনেকটা রাগান্বিতভাবে)
আমিও বুঝলাম এইখানে রাগ দেখিয়ে লাভ নেই, নিজেরই ক্ষতি হবে তাই বললাম,
- না ভাই, থাক বাদ দেন।
- আচ্ছা ঠিক আছে সমস্যা নাই তুমি নাটোর এ ঘোরাঘুরি করো, এর মধ্যে আমি পারলে তোমাকে টাকাটা তোমাকে দিয়ে দিচ্ছি। আর আমাদের কাজ শেষ হলে দেখা করবো আবার।
- আচ্ছা ভাই।
এই মানুষটার সাথে এসে আমি যখন বুঝলাম নিজেকে বড় বিপদে ফেলেছি, তখন মাথায় একটা কথা স্মরণে আসলো। আমার এক দূর সম্পর্কের মামার নাটোরে উনার নানার বাসায় ঘুরতে যাওয়ার কথা শুনেছিলাম, উনাকে ফোন দিলাম। উনিও বললেন,উনি নাটোর এ আছেন এখনো। কোনো উপায় না পেয়ে উনাকে সব ঘটনা খুলে বললাম। উনিও বললেন, সমস্যা নাই মামা তুমি ঐখানেই থাকো, আমি আসছি তোমাকে নিতে। তারপরে আমি মামার সাথে উনার নানীর বাসায় যাই, দুপুরের দিকে আমাকে ফেসবুক উনি এ মেসেজ দেন যে বিকেল ৫ টায় স্টেডিয়াম আসো।
- আমি বললাম যে, ভাই গাড়ি আনতে পারবো না, গাড়ি বাইরে নিয়ে গেছেন। (এই গাড়িটি সেই মামার মামাতো ভাইয়ের)
তখন উনি বললেন,
- আচ্ছা,তুমি একা আসবা তাহলে?
- না ভাই,আমার মামাও আসবে।
- কিন্তু আমার গাড়িতে তো তিনজন নিয়ে যাওয়া যাবে না।
- আচ্ছা ভাই,দেখি কি করা যায়।
- হুম, দেখো।
পরের দিন উনি আমাকে আবার মেসেজ দিলেন যে, কই মিয়া আসলে না যে! আমরা স্টেডিয়াম এ বসে ছিলাম।
- শরীর খারাপ ছিলো ভাই তাই আর যাইনি।
- এইটুকু জার্নিতেই?
- হ্যাঁ,ভাই।
পরেরদিন বাসার উদ্দেশ্যে মামার সাথে রওনা দেই। এর মধ্যে নীরব ভাইয়ের সাথে কয়েকবার টাকার জন্য যোগাযোগ করা হলে দিচ্ছি, আজকে না কালকে দিচ্ছি, আজকে ৫০/= দেই, ১ সপ্তাহ পরে ১০০/= দিচ্ছি এইসব বলে বলে কথা কাটিয়ে দেন।একদিন তো এই কথাও বলেন যে,
- আরে ভাই তেল তুলে তো আমরা ঘুরেছি তাইনা! তোমার টাকার তেল তো আমরা খেয়ে ফেলিনি। এইদিকে আমিও বাসায় পৌঁছে নিজের মতো দিনানিপাত করতে থাকি।
আজ ২৩/০৪/২০২৬ যখন এটি লিখতে বসেছি, এর মধ্যে বেশ অনেকটা বছর পার হয়ে গেছে, উনিও সেদিন যেই টাকা নিয়েছিলেন, বর্তমানে আমি নিজের পিছে একদিনে সেই টাকার দ্বিগুণ টাকা খরচ করি, কিন্তু সেদিন বেকার হওয়াতে আমার কাছে সেই টাকার মূল্য অনেকটাই বেশি ছিলো। যার কারণে আজও উনাকে মাফ করিনি, হাশরের ময়দানে উনার থেকে আমার প্রাপ্য করায়-গণ্ডায় আদায় করে নিবো ইন শা আল্লাহ্।

0 Comments